মহাকবি শ্রী মাইকেল মধুসূদন দত্ত

জীবনদ্রোহী মহাকবি শ্রী মাইকেল মধুসূদন দত্ত; জীবন ও সাহিত্য কর্মের সংক্ষিপ্ত সার।
এস এম রইজ উদ্দিন আহম্মদ
উপভূমি সংস্কার কমিশনার
খুলনা বিভাগ, খুলনা।

জন্ম :– বৃহত্তর যশোর জেলার কেশবপুর থানাধীন কপোতাক্ষ তীরের সাগরদাঁড়ি গ্রাম;১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি। অনেকের মতে তার সূতিকা গৃহ তালা উপজেলার গোপালপুর গ্রামে ।

পিতা:- রাজ নারায়ণ দত্ত, কোলকাতা সদর দেওয়ানি আদালতের একজন ব্যবহারজীবী (আইনজীবী ) । সুন্দরবন এলাকায় তার জমিদারি ছিল।

মাতা:- জাহ্নবী দেবী সুগৃহীনী, নিয়মিত রামায়ণ ও মহাভারত পাঠ করতেন।

শৈশব ও বাল্য শিক্ষা:- শৈশবে বেড়ে উঠা দূরন্তপনায় । বাড়ির পাশদিয়ে প্রবহমান কপোতাক্ষের স্বচ্ছ সলিল জন্মভূমির মাতৃস্তনের মত সে জলধারায় অবগাহন, সন্তরণ। মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে মহাভারত আর রামায়ণের ঘটনাবলি শুনে শুনে আত্মস্ত; মক্তবে বাংলার পাশাপাশি ফারসি ভাষা শেখা। কপোতাক্ষতীরের আর এক কৃতি সন্তান আশ্চর্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পিতা হরিশচন্দ্র রায় ছিলেন মধুসূদনের বন্ধুজন। উভয়ে বাল্যকালে শেখপুরা গ্রামের মৌলভি খন্দকার মখমল আহমেদের কাছে ফারসি শিখতেন।

কোলকাতার জীবন:- ব্যবসায়িক সুবিধা ও ছেলের লেখা-পড়ার সুবিধার্থে খিদিরপুর বড় রাস্তার পাশে একটি দ্বিতল বাড়ি ক্রয় করে নতুন বসতি গড়েন রাজনারায়ণ দত্ত। মাত্র সাত বছর বয়সে মধুসূদনকে নিয়ে আসেন নতুন বাড়িতে। ১৮৩৩ সালে কোলকাতার হিন্দু কলেজের জুনিয়র ডিপার্টমেন্টে সর্বনি¤œ শ্রেণীতে ভর্তি হন।

ইয়ং বেঙ্গলের উপসাধক :- এর কিছু দিন আগে তারুণ শিক্ষক ডিরোজিও সাহেব তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা ভঙ্গের আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সাহিত্য, কৃষ্টি,সংস্কৃতিতে সূচিত হয়েছিল নতুন. ধারা । আধুনিক জীবন মন্ত্রে দীক্ষিত তরুণ যুবকদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল ইয়ং বেঙ্গল। মধুসূদন তাকে শিক্ষক হিসেবে না পেলেও তাঁর ভাবধারায় উজ্জীবীত হন। ইউরোপিয় রেঁনেসা ও ইংরেজি সাহিত্যে হন আকৃষ্ট। বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসেন বৃহত্তর বৃত্তে। নতুন মানব মন্ত্রে বিশ^াস, পাশ্চাত্য জীবন তন্ত্রে আসক্তি, ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুারাগ, দেশীয় আচার ও ভাবনার প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ, সব বিষয়ে বিদ্রোহী মনোভাব গড়ে উঠে হিন্দু কলেজে অধ্যায়ন কালে। স্বপ্ন দেখেন কীটস ,বায়রণ, শেক্সপিয়ার- সুদূর ইংল্যা- দেয় হাতছানি । তার কন্ঠে বেজে উঠে

I sigh
To cross the vast Atlantic waves
For glory or nameless grave.

কলেজ জীবনের বন্ধু-বান্ধব :- ভূদেব মুখোপধ্যায়, রাজ নারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক, ভোলানাথ চন্দ্র মনমোহন বসু, বঙ্কু বিহারী দত্ত প্রমুখ।

জীবন দ্রোহ:- তিনি কখনও ফার্সি গজল গান গেয়ে, কোনদিন সাহেব নাপিতের দোকানে চুল কাটিয়ে, কখনো মুহুর্মুহু শেক্সপিয়ার, বায়রণ আবৃত্তি করে বন্ধুদের চমকে দিত। আবার এর সঙ্গে ছিল কোন কোন শিক্ষকের প্রতি সরব অশ্রদ্ধা, মদ্যপান, অমিতব্যয়িতা, পিতার সঙ্গে একই আলবোলায় ধুমপান, এমনকি আরো সব বিচিত্র আচরণ(মধুসূদন রচনাবলি:-ডাঃ ক্ষেত্রগুপ্ত সম্পাদিত ) । পোশাকে আশাকে , চলনে বলনে, খাদ্যাভ্যাসে তিনি ছিলেন প্রথা ভঙ্গকারী। তিনি অবলীলায় গোমাংস ভক্ষণ করতেন।

খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ:-হিন্দু কলেজের অসামান্য প্রতিভার অধিকারী মধুসূদন দত্ত হঠাৎ একদিন নিরুদ্দেশ হলেন। চারিদিকে রটে গেল তিনি খ্রিস্টান হবেন। পিতা লাঠিয়াল বাহিনী নিয়োগ করলেন । তিনি আশ্রয় নিলেন ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গে । ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মিশন রোয়ে ওল্ড মিশন চার্চে আর্চ ডিকন ডিয়াল্ট্রি তাকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করেন। ইংল্যান্ডে যাবার প্রবল বাসনা, হিন্দু ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা, গ্রাম্য এক বালিকার সাথে বিয়ের সম্পর্ক ভেঙ্গে দেয়া, সবোপরি রেভারেন্ট কৃδ মোহন বন্দোপধ্যায়ের শিক্ষিতা কন্যা দেবকীর সাথে প্রেম ও পাণি গ্রহণের ইচ্ছা তাকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হতে অনুপ্রাণীত করেছিল বলে মনে হয়। খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের পর নামের আগে যুক্ত করেন মাইকেল । তাই মাইকেল মধুসূদন দত্ত । হিন্দুত্ব না থাকায় খ্রিস্টানের জন্য হিন্দু কলেজের দ্বার বন্ধ হয়ে যায় । ভর্তি হন শিবপুর বিশপস কলেজে । ১৮৪৮ সালে রাজ নারায়ণ দত্ত পড়ার খরচ বন্ধ করে দেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দেবকী তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। লজ্জাবনত চিত্তে কোলকাতা ছেড়ে সকলের অগোচরে কবি পাড়ি জমান মাদ্রাজে।

সাহায় সম্বলহীন আশ্রয়হীন কবি দেশীয় খ্রিস্টান ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের অনুগ্রহে মাদ্রাজ মেল অরক্যান এস্ইালাম নামের স্কুলে ইংরেজি শিক্ষকের চাকুরি পান। সাংবাদিক ও কবি হিসেবে ৭ বছর কাটান মাদ্রাজে । ১৮৪৮ হতে ১৮৫২ পর্যন্ত ছিলেন ঐ স্কুলের শিক্ষক। ১৮৫২ হতে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত মাদ্রাজ বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শিক্ষকের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
মাদ্রাজে থাকাকালে রচনা করেন Visions of the past, The Captive ladie.. সাংবাদিকতা করেছেন বেশ কয়েকটি পত্রিকায় । Madras circulator and Genral Chronicle , Athenaeam Spectator প্রভৃতি।

বিবাহ ও সন্তান সন্ততি :- মাদ্রাজ গমনের অল্প দিনের মধ্যে তিনি অরক্যান এসাইলামের বালিকা বিভাগের ছাত্রী রেবেকা ম্যাক্টাভিসকে বিয়ে করেন। রেবেকার গর্ভে ২ কন্যা ও ২ পুত্র জন্ম গ্রহণ করেন। এ সময়ে পরিচয় ঘটে হেনরিয়েটার সংগে। রেবেকার সাথে বিয়ে বিচ্ছেদ না করে হেনরিয়েটার সাথে আজীবন থেকেছেন । রবীন্দ্রদাস গুপ্তের হতে তাদের মধ্যে আইনত ও ধর্ম সংগত কোন বিয়ে হয়নি। হেনরিয়েটা কোলকাতায় এসেছিলেন ১৮৫৮ সালের শেষ দিকে। হেনরিয়েটার গর্ভে ৪টি সন্তান জন্ম লাভ করে । ১৮৫৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার কলেজ বন্ধু সহপাঠী গৌরদাস বসাককে একপত্রে লেখেন “ ও যধাব ধ ভরহব ঊযমষরংয রিভব ধহফ ঋড়ঁৎ ঈযরষফৎবহ”

মাতৃ- পিতৃ বিয়োগ ও কোলকাতায় আগমন:- মাদ্রাজ গমনের ৩ বছর পর মাতা জাহ্নবী দেবী পরলোক গমন করেন। এ সময় কোলকাতায় একবার এসে পিতার সাথে দেখা করে আবার ফিরে যান মাদ্রাজে । এর কারণ অηাত। ১৮৫৬ সালের জানুয়ারিতে পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার, রেবেকার সাথে আইন সঙ্গত বিয়ে বিচ্ছেদ, সর্বোপরি বন্ধু গৌরদাস বসাকের আমন্ত্রণে ১৮৫৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ফিরে আসেন কোলকাতা ।
কোলকতার জীবন ও সাহিত্য চর্চা :- কোলকাতায় প্রথম উঠলেন বিশপস কলেজে । বন্ধুদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করেন পুলিশ কোর্টে কেরাণির চাকরি। পরে দ্বিভাষিক পদে পদোন্নতি পান। আতœনিমগ্ন করেন সাহিত্য চর্চায়। সংবাদপত্রে লেখা লেখি করে কিছু আয়ও করতে থাকেন। ৭ বৎসর একনিষ্ঠ ভাবে সাহিত্য চর্চা করেছেন। রতœাবলির ইরেজি অনুবাদ, শর্মিষ্ঠা, একেই কি বলে সভ্যতা, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো, পদ্মাবর্তী, কৃδ কুমারী প্রভৃতি নাটক ও প্রহসন রচনা করেন। নীল দর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করে এক আড়োলন সৃষ্টি করে।
তিলোওমা সম্ভব কাব্য, ব্রজাঙ্গনা, বীরাঙ্গনা কাব্য মেঘনাদ বধ মহাকাব্য রচনা করে যশ^সী হেয়ে উঠেন।
পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার ও বিদেশ যাত্রা:- কোলকাতা এসে মধুসুদন বেহাত সম্পত্তি উদ্ধারের মামালা করলেন। ১৮৬০ সালে মামলায় জয়লাভ করেন। খিদিরপুরের বাড়ি বিক্রয় করলেন ৭ হাজার টাকায়। সুন্দরবনের সম্পত্তি মহাদেব চট্রোপধ্যায়ের শ্রী মোক্ষদা দেবীকে পত্তনি দিলেন। চুক্তি হলো চার দফায় মোট তিন হাজার টাকা ইউরোপে পাঠাবেন। কবির স্ত্রীকে মাসে দেড়শত টাকা করে দেবেন । ব্যবস্থা পাকাপাকি করে ইউরোপের উদ্দেশ্যে “ক্যান্ডি” জাহাজে চাপলেন ৯ জুন ১৮৬২ । বীরাঙ্গনা কাব্য শেষ করতে গিয়ে তার মনে হয়েছে “ ঞযব ভরঃ যধং চধংংবফ ধধিু”- বীরাঙ্গনার কয়েকটি পত্র তিনি আরম্ভ করেও শেষ করতে পারেননি। উপাদান সংগ্রহ ও পরিকল্পনা রচনা করেও সিংহল বিজয় মহাকাব্যের কয়েকটি চরণ লিখে ছেড়ে দেন। ১৯জুলাই পৌছে যান ল-নে।
১৮৬২ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে ইংল্যান্ডের গ্রেজ ইন এ যোগ দেন । কিন্তু পত্তনিদার মহাদেব চট্টোপধ্যায় চুক্তির খেলাপ করলে পরিকল্পনা নষ্ট হয় । হেনরিয়েটা অর্থ কষ্টে পড়ে কোন রূপ পাথেয় সংগ্রহ করে ১৮৬৩ সালের ২ মে মাসে সন্তানদের উপর ইংল্যান্ডে পৌঁছান। কবি বিপদগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্ত হয়ে ১৮৬৩ সালের মধ্য ভাগে ফ্রান্সে চলে যান । ফ্রান্সের ভার্সাই নগরে বসে সনেট রচনা করলেন। এক বছর কোন অর্থ সংস্থান না থাকায় দারূণ কষ্টে পড়লেন। বিদ্যাসাগরকে লিখলেন চিঠি। বিদ্যাসাগর কবিকে টাকা দিয়ে বিপদমুক্ত করলেন। কবি আবার লন্ডন এসে ১৮৬৮ সালে ব্যারিষ্টার হয়ে দেশে ফিরলেন। পরিবার রেখে এলেন ইংল্যান্ডের ব্যয় বহুল হোটেল । এখানে হাইকোর্টে আইন ব্যবসায়ে ভাল করতে পারেননি। আয়ের সাথে ব্যয়ের কোন সমতা নেই। ১৮৬৮ সালে আবশিষ্ট পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেন।
১৮৬৯ সালে হেনরিয়েটা পুত্রকন্যাসহ কোলকাতায় এলেন। মধুসূদন বিপুল অঙ্কে বাড়ী ভাড়া করলেন। ১৮৭০ সালে হাইকোর্টের প্রিভিকাউন্সিল আপিলের অনুবাদ বিভাগে পরীক্ষকের পদ লাভ করেন মধুসূদন ।২ বছর এই পদে থেকে চাকুরী ছেড়ে দেন। তারপর পঞ্চকোট রাজ্যের আইন উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করে কিছুদিন পর ইস্তফা দেন। আইন ব্যবসায় পুনরায় যোগ দেন।

কবির ঢাকায় আগমন:- কোলকাতায় আইন ব্যবসায় সুবিধা করতে পারেনি। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে ১৮৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি মামলার কাজে কবি ঢাকায় আসেন। ইচ্ছে ছিল ঢাকায় আইন ব্যবসা জাকিয়ে বসায়। এখানে এসে ম্যালেরিয়া জ¦রে আক্রান্ত হন। দশ দিন পর একটু ভাল হয়ে কোলকাতায় ফিরে যান। ঢাকায় সাহিত্যমোদীরা কবিকে ঢাকা বাসীর পক্ষে সংবর্ধনা দেন। ঢাকা বাসীদের অভিনন্দনের উত্তরে বলেছিলেন ঢাকার প্রতিটি ঘরে লক্ষ্মী বাঁধা আছে। আর স্বরস্বতী সেখানকার নিত্য অতিথীনী ঢাকায় আইন ব্যবসা জমাতে না পেরে বিফল মনে ফিরে যান কোলকাতায়।
কবির শরীর ভেঙ্গে যায় । কবি উত্তর পাড়ার জমিদারের লাইব্রেরি গৃহে বাস করতে গেলেন । রোগ যন্ত্রণা, অর্থকষ্ট,ঋণ মিলে কবির জীবন হয়ে ওঠে দূর্বিষহ। স্ত্রী শয্যা নিলেন। উত্তর পাড়া হতে ফিরে এসে হেনরিয়েটা উঠলেন জামাতা উইলিয়াম ওয়ালটার এভান্স ফ্লয়েডের ১১ নম্বর লিন্ডসে স্ট্রিস্টের বাড়িতে। কবি ভর্তি হলেন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে । ১৮৭৩ সালে ২৬জুন হেনরিয়েটা পরলোকগমন করেন।

স্ত্রীর মৃত্যুর তিনদিন পর কবি দুপুর দু’টায় (১৮৭৩ সালের ২৯শে জুন) মাত্র উনপঞ্চাশ বছর ৫ মাস ৪ দিন বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর দিন সকালেও আর্চবিশপ বির্তকিত কবির মৃত্য দেহ খৃস্টানদের গোরস্তানে সমাহিত করার অনুমতি দিলেন না। এদিকে তাঁর স্বদেশবাসী তাকে গঙ্গার ঘাটে পোড়াবেনÑ তিনি নিজেই সে পথ রুদ্ধ করে গিয়েছেন। আষারের গরম তাপা দেহে মরদেহ পচতে থাকে। এই সময়ে সাহস নিয়ে এগিয়ে আসেন অ্যাংলিকান চার্চের সিনিয়র চ্যাপ নেইল Ñ রেভারেন্ট পিটার জন ড. জার্বোও । বিশপের অনুমতি ছাড়াই কবির মরাদেহ সমাহিত করার উদ্দ্যোগ নেন। ৩০ জুন বিকালে Ñ প্রায় ২৪ ঘন্টা পর সহ¯্রাধিক লোকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কবির মরা দেহ লোয়ার সার্কুলার রোডের গোরস্তানে জীবন সঙ্গী হেনরিয়েটার পাশের্^ সমাহিত করা হয়। উত্তর পাড়ায় থাকা কালে তিনি সমাধিলিপির জন্য রচনা করা করেছিলেন, ‘দাড়াও, পথিক বর, জন্ম যদি তব—————–জননী জাহৃবী’।

এই বৈচিত্র্যময় জীবন নির্বাহ করে কবি প্রায় অর্ধ শতাব্দিকাল মাত্র জীবিত ছিলেন। সময়ের বিচারে তা কখনোই দীর্ঘ নয়। তবে এই সংক্ষিপ্ত জীবন কবির সৃষ্টি সংক্ষিপ্ততম । এরচেয়ে আরও সংক্ষিপ্ত কবির কাব্যসম্ভার। আর বাঙলা কাব্য ও কবিতার কথা বলাই বাহুল্য । তবে এই ক্ষুদ্র কাব্য কীর্তির মধ্যেও বিন্দুতে সিন্ধুর প্রকাশ লক্ষ্যণীয়।

মনে রাখা আবশ্যক বাঙলা সাহিত্যের নবীন যুগের সূত্রপাত মধুসূদনের হাতে।জীবন বোধে নূতনের আগমন, দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার সাধন ,ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের উন্মেষ, ভাষার কলা নৈপুণ্য , ভাবের নবীনতা,ছন্দ অলংকারের ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন সর্বোপরি মধ্যযুগের দেব দেবীর মাহাত্ম প্রচার ও মানবের পরাজয়, ধর্মীয় আবরণের অন্তরাল থেকে বাঙলা কাব্যকে নবীন আলোয় উদ্ভাসনের একক কৃতিত্ব প্রাপ্য মধুসূদনের । অমিত্রাক্ষর ছন্দ, সনেট, উপ খ্যানকাব্য , পত্রকাব্য, মহাকাব্য এ সবই তাঁর অমর কীর্তি ।

মধুসূদনের বাঙলা কাব্যের কালানুক্রমিক তালিকা নি¤œরূপঃ-

কাব্যগ্রন্থ প্রকাশকাল
তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য ১৮৬০
মেঘনাদ বধ কাব্য ১৮৬১
ব্রজাঙ্গনা কাব্য ১৮৬১
বীরাঙ্গনা কাব্য ১৮৬২
চতুর্দশপদী কবিতাবলী ১৮৬৬
নানা কবিতা মৃত্যুর বহু পরে সংকলিত।

অসমাপ্ত কবিতা:- ডা: ক্ষেত্রগুপ্ত মাইকেল মধুসূদন দত্তের অসম্পূর্ণ কবিতাবলীর নি¤œরূপ
একটি তালিকা সঙ্কলন করেছেন।

নাম শ্রেণি পরিচয় রচনাকাল কি পরিমাণ রচিত হয়েছিল
সুভদ্রা নাট্যকাব্য ১৮৫৯ সালের শেষ দিকে কিংবা ১৮৬০ সালের প্রথম দিক দুই অঙ্ক সমাপ্ত করেছিলেন। কিন্তু কিছুই একালের হাতে এসে পৌঁছায়নি।
রিজিয়া নাটক (অমিত্রাক্ষার ছন্দে এবং গদ্যে) ১৮৬০ সালের প্রথম দিকে খুব অল্পই লেখা হয়েছিল। আলুতনিয়ার একটি স্বগতোক্তি-মূলক সংলাপের কতকাংশ মাত্র পাওয়া গিয়েছে।
ব্রজাঙ্গনা কাব্য’ এর বিহার নামক ২য় সর্গ কবিতা ১৮৬০ সালের এপ্রিলের পূর্বে মাত্র তিনটি স্তবক লেখা হয়েছিল ।
সিংহল বিজয় মহাকাব্য ১৮৬১ সালের মাঝামাঝি গোড়ার কয়েকটি পংক্তিমাত্র লেখা হয়েছিল।
বীরাঙ্গনা কাব্য এর ২য় খ- কবিতা ১৮৬২ সালের ফেব্রুয়ারির পরে গ্রন্থিত পাঁচটি কবিতা। একটি কবিতার দু’টি পাঠভেদ।
দ্রৌপদী স্বয়ম্বর মৎস্যগন্ধা সুভদ্রাহরণ পান্ডব বিজয় দুর্যোধনের মৃত্যু ভারত বৃত্তান্তের বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাহিনী কাব্য বা একটি মহাকাব্য(?) ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৪- এর মধ্যে কবিতাগুলির স্বল্পাংশ মাত্র লিখিত হয়েছিল।
দেবদানবীয়ম্ ব্যঙ্গকবিতা জীবনের শেষ ভাগে কয়েকটি চরণমাত্র লেখা হয়েছিল।

মধুসূদন দত্ত রচিত নাটকাবলির রচনাকাল ও অভিনয়ের সময়
নাটকের নাম প্রকাশ কাল প্রথম অভিনয় কাল নাট্যমঞ্চ
শর্মিষ্ঠা ১৮৫৯ ১৮৫৯ বেলগাছিয়া
একেই কি বলে সভ্যতা ১৮৬০ ১৮৬৫

১৮ জুলাই শোভাবাজার প্রাইভেট
থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি
বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ
(ভগ্ন শিব মন্দির) ১৮৬১ ১৮৬৬ আরপুলি নাট্যসমাজ
পদ্মাবতী ১৮৬০
এপ্রিল -মে ১৮৬৫
১১ ডিসেম্বর পাথুরিয়াঘাটার এক রঙ্গমঞ্চ
কৃষ্ণকুমারী নাটক ১৮৬০
প্রকাশিত ১৮৬১ ১৮৬৭
৮ ফেব্রুয়ারি শোভাবাজার প্রাইভেট থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি
মায়াÑ কানন ১৮৭৪
১৪ মার্চ ১৮৭৪
১৮ এপ্রিল বেঙ্গল থিয়েটার

মাইকেল মধুসূদন দত্তকে যে সব অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়:-
১। বাংলা ভাষার প্রথম ও একমাত্র সার্থক মহাকাব্যকার / মহাকবি
২। সমাজ ও জীবন দ্রোহী কবি
৩। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পথ প্রদর্শক, আধুনিক ভাবগঙ্গার ভগীরথ।
৪। অমিত্রাক্ষর ছন্দের জনক। সতিস্বাধীন ভাবপ্রকাশের প্রথম কবি,
৫। বাংলা সাহিত্যের সার্থক সনেট প্রবর্তক
৬। আধুনিক বাংলা নাটকের ¯্রষ্টা। প্রথম ঐতিহাসিক নাটক ও প্রথম সার্থক ট্রাজিক নাটক রচয়িতা।
৭। সার্থক প্রহসন রচয়িতা/প্রথম প্রহসন প্রবর্তক।
৮। বাংলা ভাষার পত্র কাব্য ¯্রষ্টা
৯। আধুনিক গীতি কবিতার প্রবর্তক
১০। নব জাগৃতির কবি
১১। মধুচক্রের রচয়িতা মধু কবি
১২। বাংলা ভাষার প্রথম বিদ্রোহী কবি
১৩। প্রথা ভঙ্গের কবি
১৪। স্বপ্ন বিলাসের কবি
বংশ ও পারিবারিক তথ্য
প্রপিতামহ রাম কিশোর দত্ত বর্তমান খুলনা তৎকালীন যশোর জেলার অধিবাসী । তাঁর মৃত্যুর পর তিন ছেলে রামনিধি, দয়ারাম ও মাণিকরাম মাতামহের গ্রাম সাগরদাঁড়িতে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। সাগরদাঁড়িতে এসেও রামনিধি তার অবস্থার তেমন উন্নতি করতে পারেননি । কায়স্ত পরিবার হিসেবে সেকালের রেওয়াজ অনুযায়ী সন্তানদের ফারসি ভাষা শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফলে জ্যেষ্ঠপুত্র রাধামোহন আদালতের ভাষা ফারসি জানার সুবাদে যশোর আদালতে চাকরি পান এবং ধীরে ধীরে সেরেস্তার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি ছোট তিন ভাইকে যশোর এনে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন।
মেঝ ভাই মদনমোহন প্রথমে যশোরের মীর মুনসি পরে কুমারখালির মুন্সেফ হন। সেঝ ভাই আর একটু এগিয়ে যশোরের উকিল হন। কবির পিতা রাজ নারায়ণ দত্ত ভালো ফারসি শিখেছিলেন। তাকে লোকে বলতো মুনসি রাজনারায়ণ। উকিল হয়ে তিনি অন্য ভাইদের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন। তিনি কোলকাতার সদর আদালতে ব্যবহারজীব হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেন। এক পুরুষের মধ্যে এই দত্ত পরিবার বিদ্যা এবং উদ্যোগকে ব্যবহার করে সেকালের তুলনায় প্রচুর বিত্ত উপার্জন করতে সক্ষম হন । আর সেই বিত্ত দিয়ে জমিদারি কিনে আবার দ্রুত বাবুতে পরিণত হন।
রাজ নারায়ণ বিয়ে করেছিলেন কাঠিপাড়ার জমিদার কন্যা জাহৃবী দেবীকে । সে যুগে স্ত্রী শিক্ষাকে বৈধব্যের প্রতীক বলে আখ্যায়িত করা হলে ও তিনি বিদূষী ছিলেন । তিনি কবিকে শৈশবে মহাভারত, রামায়ণ, কবি কঙ্কনের চন্ডি ও অন্নদা মঙ্গল পড়ে শোনাতেন। মাইকেলের জীবনীকারদের ভাষ্যমতে মধুসূদনের জন্ম ১৮২৪ সালের ২৫জানুয়ারি।
মধুর জন্ম সাল ও তারিখের সঠিকতা জানা না থাকলেও বিশপস কলেজের অধ্যক্ষ জর্জ উডনি উইদার্স ১৮৪৬ সালের ২৬ জানুয়ারি তারিখের একটি চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, ক’দিন আগে ১৩ জানুয়ারি মধুসূদন ডাটের বয়স ২২ বছর পূর্ণ হয়েছে। মাইকেলের বিবাহ নিবন্ধনে বিয়ের তারিখেও বছর সঠিকভাবে উল্লেখ আছে।সবদিক দিয়ে বিবেচনা করে জন্ম সাল ১৮২৪ নিশ্চিত করা গেলেও জন্ম তারিখ ২৫ জানুয়ারি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়।

মধুর জন্মের ৪ বছরের মধ্যে জাহৃবী দেবীর গর্ভে আরো ২টি সন্তান প্রসন্ন কুমার ও মহেন্দ্র নারায়ণের জন্ম হয় । প্রসন্ন কুমার এক বছর বয়সে এবং মহেন্দ্র নারায়ণ ৫ বছর বয়সে মারা যান। মাইকেল মধুসূদন দত্ত খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের পর পিতা রাজ নারায়ণ দত্ত বংশ কুল রক্ষার নিমিত্ত আর একটি পুত্র সন্তানের জন্য ২টি অল্প বয়সী রমনীকে বিয়ে করেন। তাদের গর্ভে কোন সন্তান জন্মে নি। অক্ষমতার জন্য রাজ নারায়ণকে দায়ী করা হয়।
ক্ষমাইকেল মধুসূদন দত্ত মাদ্রাজ অরক্যান এসাইলাম বালিকা বিভাগের ছাত্রী রেবেকা টমসন মেক্টাভিসকে ১৮৪৮ সালের ৩১ জুলাই বিয়ে করেন।
রেবেকার গর্ভে ১৮ আগষ্ট ১৮৪৯ সালে প্রথম কন্যা বার্থা জন্ম গ্রহণ করেন। বার্থা মারা যান ২৯ জানুয়ারি ১৮৮৪ সালে।
দ্বিতীয় কন্যা ফিবি সালফেল্ট কেনেট ৯ মার্চ ১৮৫১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি মারা যান ৩০জুলাই ১৯১৮ সালে।
তৃতীয় সন্তান পুত্র জর্জ জন্ম নেন ১ সেপ্টম্বর ১৮৫২ সালে এবং মারা যান ১৯১৫ সালে।

চুতুর্থ সন্তান পুত্র মাইকেল জেমস জন্ম গ্রহণ করেন ৯মার্চ ১৮৫৫ সালে এবং মারা যান ২১ এপ্রিল ১৮৫৬ সালে। রেবেকা টমসন ডাট এর জন্ম ১৮৩১ সালে এবং ১৮৯২ সালের ২২ জুলাই মাদ্রাজে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ মহিলা মাইকেলের ৩টি সন্তান পক্ষী শাবকের ন্যায় আগলে রাখে মানুষ করেছেন।মাইকেল ১৮৫৬ সালে মাদ্রাজ থেকে নির্দয়ের মত কোলকাতায় ফিরে এসে এদের কোন খোঁজ নেননি।

ক্ষক্ষদেখা যায় মাদ্রাজ থাকাকালে কবির সহকর্মী জর্জ হোয়াইট এর স্ত্রী অল্প বয়সী একটা কন্যাকে রেখে মারা যান। এই কন্যার নাম এ্যান রিয়েটা বা হেনরিয়েটা হেনরিয়েটার জন্ম ৯ মার্চ ১৮৩৬ সাল এবং মৃত্যু ২৬ জুন ১৮৭৩। সহকর্মীর এই কন্যার প্রতি ¯েœহানুরাগ থেকে জন্ম নেয় প্রেমের। কবি ১৮৫৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি স্ত্রী রেবেকা ও ৩টি সন্তানকে নির্দয়ের মত ফেলে চলে আসেন কোলকাতায়। আসার সময়ে জাহাজের টিকেট ক্রয়ে ছদ্মনাম ব্যবহার করেন মিঃ হোল্ট।
১৮৫৮ সালের সেপ্টম্বর মাসে হেনরিয়েটা মাদ্রাজ থেকে কোলকাতায় পাড়ি জমান । মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাথে একত্রে বসবাস করতে থাকেন (খরাব ঃড়মবঃযবৎ)। অধিকাংশ জীবনীকারদের মতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক সাথে জীবন যাপন করলেও তাদের আইন সিদ্ধ বিয়ে হয়নি।
হেনরিয়েটার গর্ভে প্রথম সন্তান কন্যা শর্মিষ্ঠা কোলকাতায় ১৮৫৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি মারা যান ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৯।
দ্বিতীয় সন্তান এম এম ফ্রেডারিকস কোলকাতায় ২১ জুলাই ১৮৬১ তারিখে জন্মগহণ করেন এবং মারা যান ১১জুন ১৮৭৫ সালে।
তৃতীয় সন্তান নামহীন কন্যা ৩আগস্ট ১৮৬৪ তারিখে জন্ম গ্রহণ করে ঐ দিনই মারা যান।
চতুর্থ সন্তান পুত্র আলবার্ট নেপোলিয়ান জন্ম গ্রহণ করেন ২৫ এপ্রিল ১৮৬৭ তারিখে এবং মৃত্যু বরণ করেন ২২ আগস্ট ১৯০৯ সালে।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের কতিপয় চরণ যা আজও প্রবাদের মত ব্যবহৃত হয়।
১। একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে
২। এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে
৩। বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী
৪। বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা
৫। সম্মুখ সমরে মোরে
৬। আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায় ।
৭। দাঁড়াও পথিকবর জন্ম যদি বঙ্গে
৮। পরদেশে ভিক্ষা বৃত্তি কুক্ষণে আচরি
৯। জুড়াই এ কান ভ্রান্তির ছলনে
১০। রেখ মা দাসেরে মনে
১১। আমি কি ডরাই সখি ভিখারী রাঘবে
১২। ফুল দল দিয়া কাটিলা কি বিধাতা শাল্মলী তরূবরে।
১৩। কপোত কপোতী যথা উচ্চ বৃক্ষ চূড়ে।
১৪। অনিদ্রায় অনাহারে সঁপি কায় মনঃ।
১৫। সম্ভাষে শৃগালে মিত্রভাবে
১৬। পড়ি কি ভূতলে শশী গড়াগড়ি যান ধূলায়।
১৭। প্রবাসে দৈবের বশে জীব তারা যদি খসে।
১৮। জন্মিলে মরিতে হবে মধুহীন করো নাগো তব মন- কোকনাদে।
অমর কে কোথা কবে চিরস্থির কবে নীর হায়রে জীবন নদে।
১৯। সেই ধন্য নরকুলে
লোকে যারে নাহি ভুলে
২০। গ্রহ দোষে দূষী জনে কে নিন্দে সুন্দরী
২১। চন্ডালে বাসও আনি রাজার আলয়ে।
২২। চন্ডালের হাত দিয়া পুড়াও পুস্তকে
২৩। পশে যদি কাকোদর গরূঢ়ের নীড়ে
২৪। গুরুজন তুমি পিতৃতুল্য
২৫। নিজ গৃহ পথ তাতঃ দেখাও তস্করে।
২৬। সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে
২৭। হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন।
২৮। নীর Ñ বিন্দু দুর্বাদলে নিত্যকিরে ঝলমলে
২৯।কে আর যাইবে একাল সমরে ? যাইব আপনি
৩০। কে সুন্দর মালা আজি পরিয়াছ গলে।
৩১। মাতৃ-পিতৃ পাদ-পদ্ম স্মরিলা অন্তিমে ।
৩২। রাজেন্দ্র – সঙ্গমে দীন যথা যায় দূর Ñ তীর্থদরশনে।
৩৩।কে সুন্দর মালা আজি পরিয়াছ গলে।
৩৪। লঙ্কার পঙ্কজ- রবি গেলা অস্থাচলে।

মধুসূদনের সাহিত্যকর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য:- বাংলাভাষায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মধুসূদন।তিলোত্তমা সম্ভব অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম বাংলা কাব্যগ্রন্থ । কাব্যটির রচনার সময় সম্ভবত ১৮৫৯ সালের জুলাই,রচনা সম্পূর্ণ হয়েছিল ১৯৬০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে । গ্রন্থকারের প্রকাশের আগে প্রথম দুই সর্গ রাজেন্দ্রেলাল মিত্র সম্পাদিত সাময়িকপত্র ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ ’ এর ১৮৫৯ সালের জুন-জুলাই ও আগষ্ট -সেপ্টেম্বর এর দুই সংখ্যায় প্রকাশিত হয় । ১৯৬০ সালের মে মাসে গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয় তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য । প্রকাশনার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেছিলেন রাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর। কবি তাঁকেই কাব্যটি উৎসর্গ করেছিলেন।

১৮৫৯ সালের শুরু থেকেই কবির পদ্মাবর্তী রচনা চলছিল । সেই সময়ে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দ আবিস্কার করেন। পদ্মাবর্তী নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় গর্ভাঙ্কে এই ছন্দের প্রথম প্রয়োগ ঘটে বলে জানা যায় । পরে তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য গ্রন্থ পুরোপুরি এই ছন্দের রচিত হয় ।

মেঘনাদবধ কাব্য :- মহাকাব্যিক বিচারে ক্রটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হলেও মেঘনাবধই বাংলাসাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্য । এর রচনাকাল ১৮৬০ সাল থেকে ১৮৬১ সালের মার্চ । গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালের জানুয়ারি মাসে,দু খ-ে। রাজা দিগম্বর মিত্র প্রথম সংস্করণের ব্যয়ভার বহন করেছিলেন। কাব্যটি উৎসর্গ করা হয়েছিল তাঁরই নামে। মেঘনাদবধ কাব্যের উপাদান বাল্মীকির রামায়ণ থেকে গৃহীত হলেও মধুসূদনের কালজয়ী সৃজনশীল প্রতিভার স্পর্শে স্বাদে ও জীবন ভাবনায় তা তাঁর নিজস্ব মৌলিক রচনা হয়ে উঠেছে। এ কাব্য রামায়ন কাহিনীর বিচূর্ণ দেশপ্রেম করে রাবন এবং ইন্দ্রজিৎকে উজ্জ্বল চরিত্রে রূপায়িত করেছেন। বীরত্বের ্আদর্শে হয়ে উঠেছে তারা ।

ব্রজাঙ্গনা কাব্য: কৃষ্ণবিরহকাতরা ব্রজবালা রাধিকার বিলাপ ও আর্তি এই গীতিকবিতাগুচ্ছের প্রাণ। এই কাব্যটি প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালের জুলাই মাসে, যদিও রচিত হয়েছিল মেঘনাদবধ কাব্য রচনার আগেই। কাব্যগ্রন্থের বিজ্ঞাপনের একস্থানে বৈকুণ্ঠনাথ দত্ত লিখেছেন, ‘তাঁহার অমিত্রাক্ষর কবিতা রচনাতে যদৃশ অনুরাগ মিত্রাক্ষরে কিছু সেরূপ নাই বটে, তথাপি তিনি যে প্রণালীতে এই ক্ষুদ্র কাব্যখানি রচনা করিয়াছে, ইহাতে তাঁহার মিত্রামিত্র উভয়াত্মক অক্ষরেই তদ্রুপ রচনার ক্ষমতা প্রতিপন্ন করিতেছে। শ্রীকৃষ্ণের লীলাবিষয়ে শ্রীমতি রাধিকার প্রেম প্রসঙ্গে অনেকে অনেক প্রকার কাব্যরচনা করিয়া গিয়াছেন ও করিতেছেন, কিন্তুু বাঙ্গালা ভাষায় এরূপ নূতন ছন্দ ও সুমধুর নবভাব পরিপূরিত কবিতা এ পর্যন্ত কেহই রচনা করেন নাই বোধ হয়।’ বৃন্দাবন কাহিনীর রূপক বর্জন করে এ কাব্যে বাধাকে তিনি মানবিক চরিত্রে স্থাপন করেছেন।

বীরাঙ্গনাকাব্য:- মাইকেল মধুসূদন দত্তের এক অভিনব পরিকল্পনার পরিণতি এই পত্রকাব্য। রোমের প্রসিদ্ধ কবি ড়ারফ এর ‘ঐবৎড়রফং’/ কাব্যের আদর্শে রচিত এ কাব্য। নায়িকাদের হৃদয়াবেগ উচ্ছৃত সংলাপ পত্রাকারে রচিত হয়েছে। পত্রখ-গুলির বিশেষত্ব এই যে, কাহিনীর খ-াংশে সূক্ষ্রভাবে গল্পরস সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এই ধরনের রচনা বাংলাসাহিত্যে এই প্রথম । মধুসূদনের বিভিন্ন চিঠিপত্র থেকে যে আভাষ পাওয়া যায় তা থেকে অনুমান করা যায়, কাব্যটি রচিত হয় ১৮৬১ সালের শেষ দিকে অথবা ১৯৬২ সালের জানুয়ারির মধ্যে । প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালের শেষ দিকে। এগার জন রমনীকে নারীত্বের আদর্শেই তিনি বীরাঙ্গনা বলেছেন। সমাজ- বিচারের নিরিখে নয় ।

চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী:- সনেট এখন বাংলাসাহিত্যের পরিচিত জনপ্রিয় একটি কবিতামাধ্যম। পাশ্চাত্য সনেটের অনুসরেণ চতুর্দশ পংক্তিযুক্ত কবিতা মধুসূদন বাংলায় প্রথম প্রবর্তন করেন। ফ্রান্সের ভার্সেলস শহরে অবস্থানকালে এই কবিতাবলীর অধিকাংশ রচিত হয় । পরে ১৮৬৬ সালের ১ আগষ্ট গ্রন্থাকারে প্রাকশিত হয় । চতুর্দশপদী কবিতাবলীতে নানা বিষয়ের সমাবেশ ঘটলেও অন্তনির্হিত সুরে কবির মানসভ্রমণের বৈচিত্র্য সহজেই ধরা পড়ে। পরিমিত আঙ্গিকবন্ধনে কবির নিজের উপলব্দি ব্যক্ত করার এই রীতিটি বর্তমানে ও অনুমৃত হয় ।

নানা কবিতা:- নানা কবিতা শিরোনামে গ্রথিত হয়েছে কবির বিভিন্ন সময়ে রচিত কাব্য- কবিতা। এই অংশের বেশিরভাগ কবিতাই নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু পুস্তাকাকারে অনুপস্থিত। রসাল ও স্বর্ণলতিকা , আত্ম – বিলাপ এর মত কবিতা কবির অপরূপ সৃষ্টির স্বাক্ষর ।
শর্ম্মিষ্ঠা নাটক:- মধুসূদনের সৃজনশীল প্রতিভা যেমন কাব্যসহিত্যকে সমৃদ্ধ ও পুষ্ট করেছে, নাট্যসাহিত্যেও সমানভাবে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। পাশ্চাত্য নাট্যরীতির অনুসরণে বাংলায় প্রথম ঐতিহাসিক নাটক ও প্রহসন তিনিই রচনা করেন। পাইকপাড়ার রাজা প্রত্যপচন্দ্র সিংহ ও ঈশ^রচন্দ্র সিংহের উৎসাহে ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় বেলগাছিয়া নাট্যশালা । এখানে ১৮৫৮ সালের ৩১ জুলাই প্রথম অভিনীত হয় শ্রীহর্ষের রতœাবলী নাটক। এই সংস্কৃত নাটকটি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন রামনারায়ণ তর্করতœ। এই নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করার সূত্রে মধুসূদন যুক্ত হন এই নাট্যশালার সঙ্গে। রাজাদের আগ্রহে উৎসাহিত হয়ে মধুসূদন শর্ম্মিষ্ঠা নাটক রচনা করেন। এটিই তাঁর প্রথম বাংলা রচনা।
বেলগাছিয়া থিয়েটারে শর্ম্মিষ্ঠা মঞ্চস্থ হয় ১৮৫৯ সালের ৩সেপ্টেম্বর । নাটকটি প্রকাশিত হয় ১৮৫৯ সালের জানুয়ারি মাসেÑ পাইকপাড়ার রাজাদেরই অর্থানুকূল্যে। মধুসূদন পরে এই নাটকের ইংরেজি অনুবাদও করেন।
পদ্মাবতী নাটক:- গ্রিক পুরাণের কাহিনী অবলম্বনে এই নাটক রচিত হয় । অমিত্রাক্ষর ছন্দ আবিষ্কারের পর মধুসূদন এই নাটকের প্রথম এই ছন্দে কবিতা লেখেন। নাটকটি প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালে ।

একেই কি বলে সভ্যতা? বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ:- বেলগাছিয়া নাট্যশালার তাগিদে এই ব্যঙ্গাত্মক প্রহসন দুটি রচনা করেন মধুসূদন দত্ত । কিন্তু প্রভাবশালী মহলের আপত্তির ফলে নাটক দুটি মঞ্চস্থ হতে পারেনি। লেখার সময় মধুসূদন দ্বিতীয় প্রহসনটির নাম দিয়েছিলেন ‘ভগ্ন শিব মিন্দির’। পরে নাম পরিবর্তন করে ‘বুড় শালিখের ঘাড়ে রোঁ’ রাখা হয়। প্রহসন দুটি একই সঙ্গে প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালে। প্রকাশনার ব্যয়ভার বহন করেন বেলগাছিয়ার ছোটরাজা ঈশ^রচন্দ্র সিং। হানিফ চরিত্রের মাধ্যমে বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁতে শক্তিশালী ও অন্যায় বিরোধী মুসলিম চরিত্রের অবতারনা ছিল অভাবনীয়।

‘একেই বলে সভ্যতা’ প্রথম অভিনীত হয় ১৮৬৫ সালের ১৮ জুলাই শোভাবাজার প্রাইভেট থিয়েট্রিকাল সোসাইটি কর্তৃক এবং ১৮৬৬ সালে আরপুলি নাট্যসমাজ কর্র্তৃক ‘ বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ।

কৃষ্ণকুমারী নাটক:- ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ লেখার পাশাপাশি মধুসূদন কৃষ্ণকুমারী রচনা শুরু করেন ১৮৬০ সালে। প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালের শেষ ভাগে। প্রকাশের সাত বছর পরে ১৮৬৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম অভিনীত হয় কোলকাতার শোভাবাজার নাট্যশালায়। নাটকটির কাহিনী রাজনৈতিক ঐতিহাসিক পরিম-লে স্থাপন করেও মধুসূদন আশ্চর্য কৌশলে নাটকটিকে বৃত্তাকার কাহিনীতে রূপায়িত করেছেন।এ নাটকটিই বাংলা সাহিত্য প্রথম ঐতিহাসিক নাটক। এ নাটকে প্রথম ট্রাজেডি রূপায়িত হয়।

মায়া-কানন:- ১৮৭৩ সালে কোলকাতায় বেঙ্গল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয় । পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মধুসূদন এই রঙ্গালয়ের জন্য লেখেন মায়া-কানন। প্রকাশিত হয় ১৮৭৪ সালের ১৪ মার্চ। নাটকটি ওই বছরের ১৮ এপ্রিল অভিনীত হয় বেঙ্গল থিয়েটারে।

হেক্টর-বধ:- মহাকবি হোমারের ইলিয়াড কাব্যের কাহিনী সংক্ষিপ্ত আকারে বাংলাভাষায় সমাপ্ত করতে পারেননি মধুসূদন। ছয়টি পরিচ্ছেদে মূল কাব্যের মাত্র বারোটি সর্গের কাহিনী বিবৃত করেছেন এই গ্রন্থে। আরো বারোটি সর্গের কাহিনী নানা করণে লেখা হয়নি। অসমাপ্ত আকারেই ১৮৭১ সালে ১ সেপ্টেম্বর গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।

গ্রন্থের উপহারপত্রে ভূদের মুখোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে কবি লিখেছেন,
….মহাকাব্য রচয়িতাকুলের মধ্যে ঈলিয়াস রচয়িতা কবি যে সর্ব্বোপরি শ্রেষ্ঠ, ইহা সকলেই জানেন……. আমাদিগের রামায়ণ ও মহাভারত রামচন্দ্রের, পঞ্চপা-বের জীবন-চরিত্র মাত্র, তবে কুমারসম্ভব, শিশুপালবধ, কিরাতার্জ্জনীয়ম্ নৈষধ ইত্যাদি কাব্য ঊরূপা খ-ের অলংকারশাস্ত্রগুরু অরিস্ততালিসের মতে মহাকাব্য বটে, কিন্তু ঈলিয়াসের নিকট এসকল কাব্য কোথায়? দুঃখের বিষয় এই যে এ লেখকের দোষে বঙ্গ জনগণ কবিপিতার মহাত্মতা ও দেবোপম শক্তি, বোধহয় প্রায় কিছুই বুঝিতে পারিবেন না। যদি আমি মেঘ রূপে এ চন্দ্রিমায় বিভারাশি স্থানে স্থানে ও সময়ে সময়ে অজ্ঞাত তিমিরে গ্রাস করি, তবুও আমার মার্জ্জানার্থে এই একমাত্র কারণ রহিল, যে সুকোমলা মাতৃভাষার প্রতি আর আমার এতদূর অনুরাগ, যে তাহাকে এ অলঙ্কারখানি না দিয়া থাকিতে পারি না।”

উপসংহার:- মাইকেল মধুসূদনের রচনা যুগে যুগে সমাদৃত। বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে অনুধাবন করতে হলে মাইকেলের রচনা অবশ্য পাঠ্য। আমাদের সাহিত্যে যে-কজন উজ্জ্বল নক্ষত্র আছেন তাঁদের মধ্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত অন্যতম। মধুসূদন পাঠ না-করলে বাংলাসাহিত্যের উজ্জ্বল একটি ধারা থেকে বঞ্চিত হতে হয়।নিজেকে আলোকিত করার জন্য, সুশিক্ষিত করার জন্য মাইকেল মধুসূদন চর্চা ভীষণ জরুরী।
সহায়ক গ্রন্থাবলী:-

১। মধুসূদন কাব্য সমগ্রÑ রতন সিদ্দিকী সম্পাদিত।
২। মাইকেল মধুসূদন রচনা সমগ্র (ইংরেজী বাংলাসহ)Ñ তপন রুদ্র সংকলিত ও সম্পাদিত।
৩। কৃষ্ণ কুমারী (নাটক)Ñ ভবানীগোপাল সান্যাল সম্পাদিত।
৪। আশার ছলনে ভুলিÑ গোলাম মুরশিদ।
৫। নব জাগৃতির কবি মধুসূদনÑ মোবাশে^র আলী।
৬। বাংলার কবি মধুসূদনÑ নীলিমা ইব্রাহিম।
৭। মধুসূদন: কবি কৃতি ও কাব্যাদর্শÑ সৈয়দ আলী আহসান।
৮। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন রচিতÑ যোগীন্দ্রনাথ বসু।
৯। মধু স্মৃতিÑ নগেন্দ্রনাথ সোম।
১০। মধুসূদন রচনাবলীÑ ক্ষেত্রগুপ্ত সম্পাদিত।

@oasisinformatics