সাগরদাঁড়ী এর দর্শনীয় স্থানসমূহ

শেখপুরা মসজিদ

সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের একটি সমৃৃদ্ধ গ্রাম শেখপুরা। এ গ্রামে মোগল আমলে অনেক ইমারত নির্মিত হয়েছিল। এ সকল স্থাপনার মধ্যে শেখপুরা মসজিদটি অন্যতম । ১৯০৪ সালের পুরার্কর্তি সংরক্ষণ আইনের ৩ (৩) ধারা মতে প্রতœতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯৭ সালে এটিকে পুরার্কর্তি হিসেবে ঘোষণা করে ও এটি সংস্কার করে। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি মোগল স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী নির্মিত। কেশবপুর হতে ১২ কি.মি. দূরে সাগরদাঁড়ি যাওয়ার পথে মধু সড়কের পার্শ্বেই এটি অবস্থিত।

ভরতের দেউল

কেশবপুর উপজেলা সদর হতে উনিশ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ভদ্রা নদীর তীরে ভরতের দেউল অবস্থিত। ১২.২০ মিটার উঁচু, ২৬৬ মিটার পরিধি বিশিষ্ট দেউলটিকে একটি টিলার মত দেখায় । ১৯২৩ সারৈ ১০ জানুয়ারি তদানীন্তন সরকার এ স্থাপনাটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। স্থানীয়ভাবে একে ভরত রাজার দেউল বলা হয়। দেউলটি গুপ্ত যুগে ( খ্রিষ্টিয় ২য় শতকে ) নির্মিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়।

প্রতœতত্ত বিভাগ ১৯৮৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেউলের খনন কাজ চালায়। এর প্রথম অংশে ঞ আকারে স্থাপনা; দ্বিতীয় অংশে একটি মঞ্চ; তৃতীয় অংশ মূল মন্দির। মন্দিরের উপরের অংশ এখন সম্পূর্ণ টিকে নেই। খননের ফলে দেউলের ভিত থেকে চূড়া পর্যন্ত ৯৪ টি কক্ষ দৃষ্ট হয়। স্থাপনাটির চারপাশে বর্ধিতাকারে ১২টি কক্ষ; বাকি ৮২ টি কক্ষ ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। দেউলটির চূঁড়ায় ৪ টি কক্ষএবং পার্শ্বে ৮ টি কক্ষ রয়েছে। স্তুপটির উপরিভাকে উপসনালয় ছিল। স্থাপনাটির গোড়ার দিকে পারপার্শ্বে ৩ মিটার চওড়া রাস্তা রয়েছে।

খননকালে এর মধ্যে পোড়া মাটির তৈরী নারীর মুখমন্ডল, দেবদেবীর নৃত্যের দৃশ্য সম্বলিত টেরাকোটার ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে এ যাবৎ প্রাপ্ত টেরাকোটার মধ্যে এটি বৃহৎ আকৃতির। তাছাড়া নক্সা করা ইট , মাটির ডাবর, পোড়া মাটির গয়না ও মূর্তিও ভগ্নাবশেষ পাওযা গেছে। এ অঞ্চলের অন্য কোন পূরাকীর্তিকে এত বড় আকারের ইট ব্যবহৃত হয় নি। খননে প্রাপ্ত পোড়ামাটির নারী মূর্তি, শিবলিঙ্গ শীহাব এটিকে একটি জৈন স্থাপনা বলে মত প্রকাশ করেছেন। ভরত- ভায়না, কাশিমপুর ও গৌরিঘোনা গ্রামসহ প্রায় ৪ বর্গ কি. মি. ্লাকা জুড়ে এ প্রতœস্থলটি বি¯তৃত। ভরতের দেউল হতে ২ কি. মি. দক্ষিণে গোরীঘোনায় আরও একটি প্রাচীন প্রতœস্থলের ধংসাবশেষ আছে। পাশ্ববর্র্তী কাশিমপুওে ডালিঝাড়া নামে আরও একটি ঢিবি আছে, যা খনন করা হয়নি। অনুমান করা হয়, প্রাচীনকালে নদীতীরে স্থাপিত এ স্থাপনাগুলো নদীগামী বাণিজ্যিক যান হতে টোল আদায়, আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার ও ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

মীর্জানগর হাম্মামখানা

বাংলার সুবেদার শাহ শুজার শ্যালকপুত্র মীর্জা সাফসি খান ১৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে যশোরের ফৌজদার নিযুক্ত হন। তিনি কেশবপুর হতে ৭ কি. মি. পশ্বিমে কপোতাক্ষ ও বুড়িভদ্রা নদীর সঙ্গমস্থল ত্রিমোহিনী নামক স্থানে বসবাস করতেন। তার নাম অনুসারে এলাকাটির নাম হয় মীর্জানগর । ত্রিমোহিনী – কেশবপুর রাস্তার পার্শ্বে মীর্জানগরের নবাববাড়ি এখন ভগ্নস্তুপ বিশেষ।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নূরল্লা খা ফৌজদার নিযুক্ত হন। তিনি বুড়িভদ্রা নদীর দক্ষিণ পাড়ে ‘ কিল্লাবাড়ি’ স্থাপন করে সেখানে বসবাস করতেন। এটার পূর্ব – পশ্চিমে দীর্ঘ । সুবি¯তৃত পরিখা খনন করে, আট দশ ফুট উচু প্রাচীর বেশিষ্ট করে এটাকে ‘ মতিঝিল’ নামকারণ করেন। এর একাংশে ‘বতকখানা’, জোনানাসহ হাম্মামখানা (গোলসখানা) ও দূুর্গেও পূর্বদিকেসদও তোরণ নির্মাণ করেছিলেন। কামান দ্বারা র্দর্গাটি সুরক্ষিত ছিল। মীর্জানগরের কামানের একটি যশোরের মণিহার মোড়ে রক্ষিত ছিল।হাম্মামখানা বাদে আজ আর কিছুই অক্ষত নেই। পূর্ব পশ্চিমে লম্বা চার কক্ষ বিশিষ্ট এবং একটি কূপ সমেত হাম্মামখানাটি মোগল স্থাপত্য শৈলীর অনুকরণে নির্মিত হয়। স্থাপনাটি চার গম্বুজ বিশিষ্ট। এর পশ্চিম দিকে পরপর দুটি কক্ষ। পুূবদিকের কক্ষ দুটি উঁচু চৌবাচ্চা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর জানালাগুলো এমন উঁচু কওে তৈরী যাতে অবস্থানকালে বাইরে থেকে শরীরের নিুাংশ দেখা যায় না। পূর্বপার্শ্বে দেয়াল বেষ্টনীর ভেতর রয়েছে ৯ ফুট ব্যাসের ইটের নির্মিত সুগভীর কূপ। কে ক’প হতে পানি টেনি তুলে এর ছাদেও দুটি চৌবাচ্ছায় জমা করে বৌদ্রে গরম কওে দেয়াল অভ্যান্তরে গ্রথিত পোড়ামাটির নলের মাতধ্যমে øান কক্ষে সরবরাহ করা হতো। স্থাপনাটির দক্ষিণ পার্শ্বে একটি চৌবাচ্চা এবং একটি আন্ডারগ্রাউন্ড কক্ষ(সুড়ঙ্গ?) রয়েছে যা তোষাখানা ছিল বলে অনুমিত হয়। ১৯৯৬ সালে প্রতœতত্ত্ব বিভাগ এটিকে পূরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে এবং সংস্কার করে।

কালোমুখ হনুমান

কালোমুখ হনুমান একটি বিপন্ন প্রাণী। এদের মুখমন্ডল কালো, লেজ শরীরের তুলনায় দেড়গুণ লম্বা. শরীর বাদামি রঙের লোমে আবৃত। কেশবপুর উপজেলার সাহাপাড়া , ব্রম্মকটি, রামচন্দ্রপুর, বালিয়াডাংগা, মধ্যকুল এলাকা এদের বিচরণক্ষেত্র।

১৫-৩০ সদস্যের সমন্বয়ে এদের পারিবারিক অবস্থান। এরা দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা করে। এদের মোট সংখ্যা ৪০০ এর অধিক। প্রতিটি স্ত্রী হমুমান প্রতি ছয় মাস অন্তর বাচ্চা প্রসব করে।

রাতে উঁচু গাছের ডালে ঘুমিয়ে রাত্রি যাপন করে। এরা নিরামিষভোজী। সূর্যোদয় হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এরা খাবার গ্রহণ করে। এদের প্রিয় খাবার পাকা কলা, আম, কাঁঠালসহ অন্যান্য ফল, বাবলা গাছের কঁচি পাতা, মানুষের দেয়া রুটি, বাদাম,বিস্কুট ইত্যাদি । এদেরকে খাবার দিলে এগিয়ে এসে খাবার গ্রহণ করে। খাবার দিতে দেরি করলে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। অভুক্ত হতে পথচারিদের কাপড় টেনে ধরে। খাবার পেলে খেয়ে চলে যায় । দল বেঁধে এরা চলাচল করে। এরা খুবই অনুভূতিশীল। এদের আঘাত করতে শক্রকে প্রতিঘাতের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয়। একের বিপদে অন্যেরা এগিয়ে আসে, পাল্টা আক্রমন চালায়, প্রতিবাদ জানায়। প্রাপ্ত খাবার ভাগাভাগি করে,আবার কখনও কাড়াকাড়ি করে খায়।

এক সদস্যের মৃত্যুতে অন্য সদস্যরা সহমর্মী হয়ে মৃতদেহের পাশে উপস্থিত হয়ে শোক প্রকাশ করে। টেলিভিশন, সিডি ও আয়নায় ছবি দেখে অনুভূতি প্রকাশি করে। তবে ছাতা উঁচু করলে শিকারির বন্দুক ভেবে ভয় পায়, পালিয়ে যায়। অসুস্থতায় স্থানীয় পশু হাসপাতালে উপস্থিত হয়, চিকিৎসা নেয়। আঘাত প্রাপ্ত না হলে এরা হিংস্র হয়ে ওঠে না।

ধীরাজ ভট্রাচার্যের বাড়ি

টেকনাফের মাথিনের কূপকে কেদ্র করে ধীরাজ- মাথিনের প্রেম কাহিনী একটি কালজয়ী উপাখ্যান। মাথিনের দারোগা বাবু ধীরাজ ভট্রাচার্য কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়া গ্রামে ১৯০৫ সালে জন্ম নেন। ১৯২৪ সালে ধীরাজ তাঁর বাবার ইচ্ছেয় পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন এবং আরাকান হিলস চট্রগ্রাম জেলার টেকনাফ থানায় কর্মরত হন। এ সময় তিনি মাথিনের প্রেমে পড়েন।তার এ প্রেম ও পুলিশ বিভাগের চাকরির ঘটনাবলি নিয়ে লেখা তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ যখন পুলিশ ছিলাম’ । তাঁর পুলিশ জীবনের ইতিঘটে চলচ্চিত্রে অভিনয়ে যোগদানের মাধ্যমে।

কলকাতায় বসবাস করলেও জন্মভূমি পাঁজিয়া ছিল তার চারণক্ষেত্র। সময় সুযোগ পেলেই তিনি পাঁজিয়া আসতেন । দূর্গাপূজার সময় গ্রামের ছেলেদেও সাথে নাটকে অভিনয় করতেন। তিনি দু’শ ছায়াছবিতে এবং পঞ্চাশটির মতো নাটকে অভিনয় করেছেন। ‘ যখন নায়ক ছিলাম’ তার অপর কালজয়ী উপন্যাস । ১৯৫৯ সালের ৪ মার্চ চলচ্চিত্র শিল্পের নায়ক ও সাহিত্যিক ধীরাজ ভট্রাচার্যের মৃত্যু হয়।

কেশবপুর থেকে ৮ কি.মি. পূর্বদিকে পাঁজিয়া গ্রামে তার পূর্ব পুরুষের দ্বিতল বসতবাড়ি, পাঁজিয়া হাইস্কুল ও নাট্যমঞ্চ ধীরাজের স্মৃতিধন্য।

মনোজ বসুর বাড়ি

কথাশিল্পী মনোজ বসু ১৯০১ সালের ২৫ জুলাই কেশবপুরের ডোঙ্গাঘাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার কাব্যগ্রন্থঃ বঙ্গলক্ষী, বিচিত্রা; উপন্যাসঃ নিশিকুটুম্ব, ভুলিনাই, সৈনিক, বাঁশেরকেল্লা; গল্পঃ বনমর্মর, নরবাঁধ; ভ্রমণ কাহিনীঃ চীন দেখে এলাম, নূতন ইউরোপ নূতন মানুষ, সোভিয়েতের দেশে; নাটকঃ নূতন প্রভাত, বিপর্যয়, রাখিবন্ধন, শেষ লগ্ন উল্লেখযোগ্য।

তিনি সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার, শরৎচন্দ্র পুরস্কার, মতিলাল ঘোষ পুরস্কার পেয়েছিলেন। কেশবপুরের কৃতিসন্তান সুসাহিত্যিক মনোজবসু ১৯৮৭ সালে ২৭ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। কেশবপুর থেকে পাঁজিয়া হয়ে ৮ কি.মি.দূরে ডোঙ্গাঘাটা গ্রামের তাঁর বাড়িটি সাহিত্য প্রেমীদের আজো আকর্ষণ করে।

মধুপল্লী

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরিবারের সাগরদাঁড়িস্থ আবাসস্থলটি ঘিরে মধুপল্লী স্থাপিত হয়েছে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এ বাড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রপিতামহ রামকিশোর দত্ত খুলনা জেলার তালা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতামহ রামনিধি দত্ত ছোট ভাইদেও নিয়ে মামার বাড়ি সাগরদাঁড়িতে চলে আসেন। রামনিধির চার ছেলের মধ্যে রাধামোহন আদালতের সেরেস্তাদার, মদনমোহন মুন্সেফ, দেবীপ্রসাদ ও রাজনারায়ণ উকিল ছিলেন। রাজনারায়ণ দত্ত কলকাতায় উকালতি করে প্রচুর অর্থশালী হয়েছিলেন। তিনি সাগরদাঁড়িতে জমিদারি ক্রয় করেন ও বাড়িতে কিছু অট্রালিকা ও দেবালয় স্থাপন করেন। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর দেবালয়টিতে প্রতিবছর দূর্গাপূজা হয়। এ বাড়ির পূর্ব-পশ্চিম পার্শ্বে তার জ্ঞাতিদের বাড়ি ও জমিদারির কাছারি রয়েছে। পশ্চিম পার্শের বাড়িটিতে জন্ম নিয়েছিলেন।

১৯৬৮ সালে প্রতœতত্তব বিভাগ বাড়িটি সংস্কার করে এবং ১৯৯৬-২০০১ সালে এলাকাটি দেয়াল বেষ্টিত করে একটি কুটিরের আদলে গেট, একটি মঞ্চ, দুটি অভ্যর্থনা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ সময় বাড়ির সমুদয় স্থাপনাকে পুনঃসংস্কার করে বর্তমান রুপ দেয়া হয়।

মধুসূদনকে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, সাগরদাঁড়ি পর্যটন কেন্দ্র, মধুসূদন মিউজিয়াম। কপোতাক্ষের পাড়ে কবির স্মৃতি বিজড়িত কাঠবাদাম গাছ ও বিদায় ঘাট পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কথিত আছে ১৮৬২ সালে কবি যখন সপরিবারে সাগরদাঁড়িতে এসেছিলেন তখন ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে জ্ঞাতিরা তাঁকে বাড়িতে উঠতে দেয়নি। তিনি এ কাঠবাদাম গাছের তলায় তাঁবু খাটিয়ে ১৪ দিন অবস্থান করে, বিফল মনে কপোতাক্ষের তীর ধরে হেঁটে বিদায়ঘাট হতে কলকাতার উদ্দেশ্যে বজরায় উঠেছিলেন।১৯৬৫ সালে ২৬ অক্টোবর তদানীন্তন সরকার বাড়িটি পূরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। মধুসূদনের পরিবারের ব্যবহার্য কিছু আসবাবপত্র ও অন্যান্য স্মৃতিচিহৃ নিয়ে এ বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধুসূদন জাদুঘর । স্থাপিত হয়েছে লাইব্রেরি।

@oasisinformatics